#তুমিহীনা_বৃথা_সব

#সাদিয়া_সুলতানা_মনি

#পর্ব_তৃতীয় 


সাওদার নিখোজের আজ ৬০তম দিন পূর্ণ হলো।।ওইদিন সাওদার ভাইকে জানানোর পর তার বাপ-ভাই আর সাফওয়ান মিলে পুরো শহর চিরুনি তল্লাশি করে ফেলেছে। সাফওয়ান যেহেতু প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে আছে তাই সাওদাকে খোজার কাজটা গুরুত্বের সাথে করেছে পুলিশ। কিন্তু কোথায় সাওদা..?! তার যেনো অস্তিত্বই মুছে গেছে এই শহরের বুক থেকে।।


সাফওয়ানদের বিল্ডিংয়ের দারোয়ান চাচার ভাষ্যমতে সাওদা যেদিন বাসা থেকে বের হয় সেদিনের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে পুলিশ। সেখানে তার হাতে ছোট একটা কাপড়ের ব্যাগ দেখে। এটা দেখে তারা ধারণা করে সাওদা নিজ ইচ্ছায় চলে গিয়েছে। যেহেতু সাফওয়ান নিজে তাকে তার জীবন থেকে চলে যেতে বলেছে। সাফওয়ান পুলিশ ও সাওদার পরিবারকে সব কথাই জানায়। সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে আর সাফওয়ানের কথা শুনে কারোই বুঝতে বাকি থাকে না সাওদা নিজ ইচ্ছায় গৃহত্যাগী হয়েছে।তারপর থেকে পুলিশও আর বেশি জোর দেয় না সাওদাকে খুঁজতে। 


সাওদার পরিবারের সাথেও সাফওয়ানদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে। পুলিশ সাওদার খোজ করা বন্ধ করে দিলেও সাফওয়ান দেয় না। সাফওয়ানের যে তার প্রেয়সীকে লাগবে নিজের জীবনে। তাদের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝি শেষ করে তারা আবার হ্যাপি ফ্যামিলি হবে। এর মধ্যে সাফওয়ানের মা আবার অসুস্থ হয়ে একমাস হসপিটালে ছিলো। মেয়ের মতো পুত্রবধুকে হারিয়ে সে প্রচন্ড শোকাহত তার উপর ছেলেটাও বউয়ের জন্য বলতে গেলে এক প্রকারে গৃহত্যাগী। এত এত টেনশন আর মানসিক চাপ না নিতে পেরে হার্ট অ্যাটাক করে বসেন। সাফওয়ান ও তার ভাই-বোনদের অবস্থা সংকটাপন্ন ছিলো বলে সাওদার পরিবার তাদের থেকে আর মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারে নি। এগিয়ে এসেছিলো তাদের দুঃসময়ে। বাড়িয়ে দিয়েছিলো সাহায্য-সহানুভূতির হাত। সাফওয়ানের মায়ের অসুস্থতার জন্য সাওদাকে খোঁজা করার কাজটা অনেকটাই ঝিমিয়ে পরেছিলো। ডাক্তাররা তাকে হসপিটাল থেকে ছুটি দিলে সাফওয়ান পুনরায় পুলিশ স্টেশনে যায় সাওদাকে খোজার বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে।


এই গল্পের সকল পর্ব এবং আপডেট জানতে "সাদিয়ার গল্পের জগৎ" পেইজটাকে ফলো করতে পারেন।

সেখানে পুলিশদের সাথে কথা বলে এটা বুঝতে পেরেছে পুলিশরা হাল ছেড়ে দিয়েছে। তারা আর সাওদাকে খুজতে তেমন একটা সাহায্য-সহযোগীতা করবে না। তাই সাফওয়ান নিজের উদ্বোগে সাওদাকে খুজতে থাকে। কিন্তু ফলাফল শূণ্য। তার এমন অবস্থা দেখে তার এক কলিগের পরামর্শ দেয় একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ হায়ার করতে সাওদাকে খোজার জন্য। সাফওয়ান তাই করে। আজ তার সাথেই আবার দেখা করতে যাচ্ছে সাফওয়ান।


ডিটেকটিভটির নাম জুবায়ের মাহমুদ আদিল। সাফওয়ান আদিলের অফিসে এসে রিসেপশনিস্টকে তার আসার কথা জানাতে বলে আদিলকে। রিসেপশনিস্ট ফোন করে আদিলের পি.এ.কে সাফওয়ানের কথা বললে তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে। কি আর করার অপেক্ষা ছাড়া সাফওয়ানের আজকাল আর কোন কাজ নেই। 


আধা ঘন্টা ওর আদিলের পি.এ. এসে সাফওয়ানকে ডেকে নিয়ে যায়। সাফওয়ান প্রাথমিক কথাবার্তা শেষ করে কাজের কথায় যায়।আদিল বলা শুরু করে---


---মি.জুহায়ের আজ আপনার স্ত্রীর নিখোঁজের ৬০তম দিন পূর্ণ হলো তাই না..?!


---হুম,,কিন্তু আজও আমি তার কোন খোজ পেলাম না।


---কেউ যদি হারিয়ে যায় বা কিডন্যাপ করা হয় তাহলে তাকে খুঁজলে পাওয়ার সম্ভবনা থাকে। কিন্তু যে নিজ থেকে হারিয়ে যায় তাকে খুঁজে আদৌও কি পাওয়া যায়..?আপনি বিজ্ঞ মানুষ আপনার কাছে আমার প্রশ্ন রইলো।


---আমি জানি না কিচ্ছু আপনি প্লিজ আমার ওয়াইফকে খুজে এনে দেন। প্লিজ,,আপনার যতো টাকা লাগবে আমি দেবো তাও তাকে খুজে এনে দেন।


---টাকা দিলেই যদি হতো তাহলে এতোদিন আপনার বউ আপনার ঘরে থাকত মি.জুহায়ের। তাই নয় কি..?!


---(নিশ্চুপ)


---যাই হোক আপনার ওয়াইফের কল লিস্ট বলছে সে হারিয়ে যাওয়ার কিছু দিন আগে তিনি ডা.জয়া নাক একজন বের সাথে দেখা করেছিলো। তার সাথে আপনার ওয়াইফের কি কাজ থাকতে পারে আপনি কি কিছু ধারণা করতে পারছেন..?


---তার কাছে আমরা গিয়েছিলাম বেশ কয়েক বার।আমার একটু ট্রিটমেন্টের জন্য।


---কীসের ট্রিটমেন্ট জানতে পারি..?!


সাফওয়ান অস্বস্তি হচ্ছিল আদিলকে কথাগুলো বলতে। আদিল তখন বলে---


---আপনার ছোট থেকে ছোট একটা ক্লু আমাদের অনেক সাহায্য করবে আপনার ওয়াইফকে খুজতে।


তার কথা শুনে সাফওয়ান নিজের সব অস্বস্তি এক সাইডে রেখে বলে---


---আমরা লাস্ট কয়েক বছর ধরে ফ্যামিলি প্ল্যান করছিলাম,, কিন্তু বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছিলাম। তখন আমার এক কলিগ ডা.জয়ার কথা বলে। আমরা তার কাছে প্রায়ই দুই বছর ট্রিটমেন্ট নেই। কিন্তু তাও আমাদের কোন বাচ্চা হচ্ছিলো না। তারপর আমিই বলি আর কোন ট্রিটমেন্ট নেবো না। আল্লাহ যা করবেন দেখা যাবে।


এই গল্পের সকল পর্ব এবং আপডেট জানতে "সাদিয়ার গল্পের জগৎ" পেইজটাকে ফলো করতে পারেন।

আদিল সাফওয়ানের সব কথা মনযোগ দিয়ে শুনে।তার পর তাকে জিজ্ঞেস করে---


---তাহলে আপনার মিসেস আবার ওইদিন আবার কেন উনার কাছে গিয়েছিলো..?!


---সেটা তো আমার জানা নেই মি.আদিল।


---বাহ আপনার ওয়াইফ ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে আর আপনি হাসবেন্ড হয়ে জানেন না কেন সে যাচ্ছে।। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত না..?!


---অদ্ভুত হবে কেন..?আমার কি কোন কাজ নেই যে আমার ওয়াইফ কোথায় যাচ্ছে,, কি করছে তার খোজ খবর নেবো বসে বসে। তাছাড়া আমি আমার ওয়াইফকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছি আর আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে আমার ওয়াইফের উপর।


---সব বুঝলাম কিন্তু আপনার ওয়াইফ শুধু শুধু তো আর গাইনী স্পেশালিষ্টের কাছে যাবে না। নিশ্চয় তেমন কোন কারণ ছিলো যার কারনে সে এতোদিন পর আবার সেই ডাক্তারের কাছে গিয়েছে।। 


---আপনি কি বলতে চাইছেন একটু ক্লিয়ার করবেন প্লিজ..?!


---আমি আপাতত কিছুই বলতে চাচ্ছি না কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।


---কি..?!


---আপনারা কল লিস্টের মাধ্যমে স্পষ্ট জানতে পারছেন আপনার ওয়াইফ ডা.জয়ার সাথে সর্বশেষ সাক্ষাৎ করেছে তাহলে আপনারা তাকে ইন্টারোগেট করেন নি কেন..?তার সাথে দেখা করলে হয়তো অজানা অনেক কিছুই জানতে পারতেন।


---আপনাকে কে বলল পুলিশ টিম তার কাছে যায়নি..?আমি এবং পুলিশের একটা টিম গিয়েছিলাম তার চেম্বারে কিন্তু সে তখন আউট অফ দ্যা কান্ট্রি ছিলো। তার এসিস্ট্যান্টের কাছ থেকে জানতে পারি সে কোন একটা কোর্সের জন্য লন্ডন গিয়েছে,,আসবে দুমাস পর। তার পারসোনাল নাম্বার চাইলে উনি জানান ডা.জয়া তার পারসোনাল নাম্বার কাউকে দিতে নিষেধ করেছেন। এমনকি তার এসিস্ট্যান্ট নিজেও তার নাম্বার জানে না।


আদিল সাফওয়ানের কথা শুনে কিছু ভাবে তারপর হুট করে বলে---


---আপনি বললেন সে দু'মাসের কোর্সে গিয়েছে,, দুমাস তো আরো আগেই শেষ হয়েছে তারপর কি ডা.জয়ার সাথে দেখা করেছিলেন..?!


---নাহ,,আমার তার কথাটা মাথা থেকে বের হয়েই গিয়েছিলো।


---আপনি তার সাথে একটা অ্যাপোয়েনমেন্ট ঠিক করেন। আজ হলে আরো বেশি ভালো হয়।


সাফওয়ান আদিলের ক্যাবিনে বসেই ডা.জয়ার সাথে দেখা করার অ্যাপোয়েনমেন্ট ঠিক করে ফেলে৷ লাঞ্চের পর তাদের যেতে বলেছে।সাফওয়ান আদিলকে কথাটা বলে বের হয়ে আসে তার ক্যাবিন থেকে। আদিলের অফিসের পাশের একটা ক্যাফেতে বসে বাকি সময়টা কাটায়। আজ তার অফিস নেই,,ছুটি নিয়েছে। 


এই গল্পের সকল পর্ব এবং আপডেট জানতে "সাদিয়ার গল্পের জগৎ" পেইজটাকে ফলো করতে পারেন।

সাফওয়ান ঠিক টাইমে আবার উপস্থিত হয় আদিলের অফিসে। সেখান থেকে তারা দুজন রওনা হয় ডা.জয়ার উদ্দেশ্য। আধা ঘন্টা পর তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছে যায়। লাঞ্চের পর ডা.জয়া ফ্রি-ই থাকেন। তারা ডাইরেক্ট তার ক্যাবিনে যায়।


ডা.জয়া সাফওয়ানকে দেখে বলে---


---আরে মি.সাফওয়ান আপনি একা যে,আপনার মিসেস কোথায়..?


---হঠাৎ আমার মিসেসের কথা জিজ্ঞেস করলেন যে ডা.?!


সাফওয়ান এবং আদিল চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করে সাফওয়ান।। ডা.জয়া বলে---


-- তাহলে কি আপনারা অন্য কোন ডাক্তারের আন্ডারে রেখে আপনার ওয়াইফের ট্রিটমেন্ট করাচ্ছেন..? 


---মানে.?কি বলছেন আপনি উল্টো পাল্টা..? আমার ওয়াইফের কি হয়েছে..?! 


সাফওয়ান বসা থেকে উঠে অস্থির হয়ে কথাগুলো বলে। আদিল কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে বিষয়টা। তাও সে নিরবতা অবলম্বন করে। ডা.জয়া নিজেই বলে---


---আপনি এতো অবাক হচ্ছেন যে,,কেন আপনি কি জানেন না আপনার ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট..?! 


সাফওয়ানের দুনিয়া যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। ডা.জয়া কি বললো তা তাৎক্ষণিক তার মস্তিষ্ক ক্যাচ করতে পারে না। তাই সে আবার জিজ্ঞেস করলো ডা. কে---


---আপনি কি বললেন আমি বুঝতে পারি নি ডা.। কাইন্ডলি আবার বলবেন..?!


---আমি বলেছি যে আপনার ওয়াইফ গর্ভবতী।আপনারা প্যারেন্টস হতে চলেছেন খুব শীঘ্রই। 


সাফওয়ানের ডা.জয়ার কথা শুনে মাথা ঘুরে যায়,সে দাঁড়ানো থেকে পরে যেতো লাগলে আদিল তার হাত ধরে ফেলে আর চেয়ারে বসিয়ে দেয়।ডা.জয়া তাড়াতাড়ি করে এক গ্লাস পানি দেয়। সাফওয়ান পানিটা খেয়ে থম মেরে বসে থাকে।


ডা.জয়া খানিক বাদে জিজ্ঞেস করে---


---আর ইউ ওকে মি.জুহায়ের..?!আপনি কি এখন একটু ব্যাটার ফিল করছেন..?!


সাফওয়ান হ্যাঁ বা না কিছুই বলে না।আদিল সাফওয়ানের মনের অবস্থা বুঝতে পারে।তাই সে নিজেই ডা.জয়াকে বলে---


---হ্যালো ডা. আমি জুবায়ের মাহমুদ আদিল। প্রাইভেট ডিটেকটিভ। মি.সাফওয়ান জুহায়ের আবির আমাকে হায়ার করেছে তার স্ত্রীকে খুজে বের করার জন্য যে কিনা আজ ২মাস ধরে নিখোঁজ। 


ডা.জয়া লাস্টের কথাগুলো শুনে ভীষণ চমকে যায়।সে বলে ---


---ও মাই গড। এই অবস্থায় সে নিখোঁজ। আপনারা কি তার কোন খোজে পাননি.?


---আপাতত তো না।আপনি যদি তাদের সম্পর্কে যা কিছু জানেন আমাকে বলেন তাহলে আমার মিসেস সাওদা জুহায়েরকে খুজতে হেল্প হবে।।


---জ্বি অবশ্যই। তারা দু'জন আমার কাছেই ট্রিটমেন্ট করিয়ে ছিলেন। মি. এন্ড মিসেস জুহায়েরের বিয়ের দু'বছরেও মিসেস জুহায়ের কনসিভ করতে পারছিলেন না। আমি তাদের কিছু টেস্ট করাই।সেখানে প্রবলেম আসে মি.জুহায়েরের।


ডা.জয়ার কথা শুনে সাফওয়ান একের পর এক ঝটকা খাচ্ছে। সে ডা.কে বলে---


---আমার প্রবলেম মানে..?!তাহলে তখন রিপোর্ট পাওয়ার পর যখন আপনার কাছে আসলাম সেদিন কেন বললেন না আমার প্রবলেম ছিলো..?!


সাফওয়ান কেমন পাগলের মতো করছে। তার সমস্যা ছিলো তাহলে সাওদাকে কেন এতদিন এত লাঞ্চনা সহ্য করতে হলো। শেষমেশ সেও তো সাওদাকে আর সকলের মতো চরম কষ্ট দিলো। তার মাতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন করলো,,তাকে তার জীবন থেকে চলে যেতে বাধ্য করলো।


 সব পর্বের লিংক 👇

https://www.facebook.com/share/p/18MeyxYMEh/


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url